গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদের ঠিক বিপরীতে ৮ দশমিক ৮৭ একর জায়গাজুড়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক ও খেলার মাঠ। বৃক্ষ আচ্ছাদিত পার্কের তুলনায় খেলার জায়গাই বেশি এখানে। কিন্তু বিশাল মাঠ থাকলেও প্রতিদিন বিকালে স্থানীয় শিশু-কিশোররা খেলে পার্কের অংশের গাছের ফাঁকে ফাঁকে। কারণ বড় অংকের টাকা ছাড়া খেলা যায় না মাঠে। নাফিদ নামে এক কিশোর বলেন, বড় মাঠে স্লট নেওয়া ছাড়া খেলা যায় না। স্লট নিতে অনেক টাকা লাগে। টাকা থাকলে আমরা স্লট নিয়ে খেলি নয়তো এখানে তেমন একটা আসিও না। আজকে বন্ধুদের সঙ্গে হাটতে এসে খেলতে মন চাইলো তাই এই ছোট্ট জায়গায় খেলছি। আরেক কিশোর বলেন, মাঝে মাঝে টাকা জমিয়ে আমরা খেলতে আসি। টাকা না থাকলে ১০০ ফিট রোডের খালি জায়গায় গিয়ে খেলি। কারণ এখানেতো টাকা ছাড়া খেলা যায় না। শনিবার বিকাল। স্থানীয় শিশু-কিশোররা যখন গাছের ফাঁকে খেলছে ঠিক তখন বড় মাঠে চলছে ক্লাবে ভর্তি খেলোয়াড়দের ক্রিকেট কোচিং। অন্যদিকে ফুটবল খেলার নির্ধারিত টার্প চড়া দামে ভাড়া নিয়ে খেলছে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। যা ভাড়া দিয়েছে মাঠের নিয়ন্ত্রণকারী গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব। ২০২২ সালে মাঠটির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নকাজে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় আট কোটি টাকা। নগরবাসীর টাকায় তৈরি এই মাঠ উন্মুক্ত থাকার কথা সবার জন্য। কিন্তু সধারণ মানুষতো বটেই এই মাঠে সাংবাদিক প্রবেশেও পড়তে হয় বাধার মুখে। মাঠে প্রবেশ করতেও মুখিমুখি হতে হয় নানান জবাবদিহিতার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবের সেক্রেটারি জেনারেল মেহেদী হাসান বলেন, এই মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত। সবাই এখানে খেলতে পারে আমরা কাউকে বাধা দেই না। শুধু শর্ত হলো ওয়েবসাইটে স্লট বুকিং দিয়ে আসতে হবে। তার দাবি, মাঠের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে করা হয়েছে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। স্লটপ্রতি ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্লটের দাম ভিন্ন ভিন্ন করম। আমরা আয়ের জন্য এই টাকা নেই না। শুধু মাঠ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নিতে হয়। মাঠ চালাতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক রাখতে অনেক খরচ হয়। নূন্যতম খরচটা আমরা নেই। মূলত মাঠ চলে আমাদের সদস্যদের চাঁদার টাকায়। কিন্তু সেই নূন্যতম খরচের পরিমাণ কত জানতে গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবের ওয়েবসাইটের ভিজিট করে দেখা যায়, এই মাঠে থাকা ফুটবল টার্ফে খেলতে সময় ভেদে প্রতি দেড় ঘণ্টার জন্য গুনতে হবে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা। ব্যাডমিন্টন খেলতে ৮০০-১৪০০, টেনিসের জন্য ৮০০ থেকে এক হাজার, বাস্কেটবলের জন্য দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার, সাঁতার কাটতে দিতে হবে ৬০০ থেকে ছয় হাজার, জিমনেসিয়ামে ব্যায়াম করতে দিতে হবে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সপ্তাহের স্লট ও তারমূল্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় সেই সময়ে আর্টিফিশিয়াল ফুটবল টার্ফে দিনে দেড় ঘণ্টা করে সাত থেকে নয়টি স্লট বরাদ্দ দিতে দেখা গেছে। সময়ভেদে প্রতি স্লটের ভাড়া নেওয়া হয় পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার পর্যন্ত। এতে দৈনিক গড় আয় ৩৭ হাজার টাকা। টেনিস কোর্টে স্লট রয়েছে ৪০টি। টেনিসে স্লটপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা করে। দিনে যার মোট আয় দাঁড়ায় গড়ে ২৮ হাজার টাকা। বাস্কেটবলে ৭০ মিনিট করে পাঁচটি স্লট রয়েছে। প্রতিটি স্লট ভাড়া হয় তিন হাজার টাকায়। দিন শেষে যার যোগফল দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকা। ব্যাডমিন্টনে দুইটি কোর্টের একটি দুই জনের অপরটি চার জনের। দুইজন খেলোয়াড়ের কোর্টে ৫০ মিনিট করে দিনে ২৫টি এবং চার জনের কোর্টে রয়েছে ২০টি স্লট। দুইজনের কোর্টে প্রতি স্লটের ভাড়া নেওয়া হয় ৮০০ এবং চার জনের কোর্টে নেওয়া হয় এক হাজার ৪০০ টাকা করে। দুই কোর্টের ৪৫টি স্লট ভাড়া দিয়ে দিনে আয় ৩৭ হাজার টাকা। সুইমিংপুলে ১১টি স্লট প্রতিটিতে জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রতি স্লটে সুইমিং করতে পারে নূন্যতম ১০ জন। অর্থাৎ সারাদিনে ১১০ জন সুইমিং করলে ৬০০ টাকা করে আয় হয় ৬৬ হাজার টাকা। জিমনেসিয়ামে নারী পুরুষ মিলিয়ে স্লট রয়েছে আটটি। সাধারণত জনপ্রতি প্রতি দুই ঘণ্টার জন্য ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে নারীদের জন্য স্পেশাল জিমে প্রতি দেড় ঘণ্টায় নেওয়া হয় চার হাজার টাকা। জিমনেসিয়ামে প্রতি স্লটে গড়ে সাত জনের ৫০০ টাকা করে ধরলেও দিনশেষে এখান থেকে গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবের আয় ২৮ হাজার টাকা দাঁড়ায়। সবগুলোর যোগফল বলছে, শুধু স্লট বরাদ্দ বাবদ প্রতিদিন এই মাঠ থেকে গড়ে ২ লাখ ১১ হাজার টাকা আয় করছে গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব।
এছাড়া বড় ক্রিকেট মাঠে খেলতে এবং ক্রিকেট নেটে অনুশীলন করতেও তাদের অফিস থেকে টাকার বিনিময়ে স্লট বরাদ্দ নিতে হয়। যার মূল্য ওয়েবসাইটে বিস্তারিত দেওয়া নেই। উল্লেখ ছিল না ক্রিকেট কোচিংয়ের ফি-ও। ধারণা করা হয় সব মিলিয়ে এই মাঠ থেকে মাসে প্রায় ৭০ লাখ টাকা আয় করছে ক্লাবটি। আইন কি বলছে? ২০০০ সালের খেলার মাঠ ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনের ধারা ৫ এবং ধারা ৮-এ বলা হয়েছে সরকারি বা যেকোনো পাবলিক মাঠ ও পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ভাড়া বা ইজারা দেওয়া আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ৯০ এর দশকে এই পার্কের একাংশে ছিল ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক। যার বাণিজ্যিক ব্যবহারের বৈধতার প্রশ্ন গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত। সরকারি মাঠের বাণিজ্যিক ব্যবহার অবৈধ ঘোষণা করে ২০০৯ সালে আদালত নির্দেশ দেন এই মাঠ থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত। সেই নির্দেশনার আলোকে ওয়ান্ডাল্যান্ড পার্ক উচ্ছেদ করা হয়। পরে তৎকালীণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় মাঠটি দখলে নেয় গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব। যদিও এতে জোর আপত্তি ছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের। গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব মাঠের জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করলে ২০১৩ সালে সেটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয় রাজউক। এ নিয়ে রাজউকের বিরুদ্ধে আদালতে যায় ক্লাবটি। কিন্তু এই মাঠ নিয়ে সবশেষ ২০২২ সালে হওয়া রায়েও হারে ক্লাবটি। সেই রায়েও আদালত এই মাঠকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু যেই রাজউক এতদিন ক্লাবটিকে মাঠ থেকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছে তারাই এখন আদালতের রায়কে উপেক্ষা করে চুক্তির মাধ্যমে মাঠ ব্যবস্থাপনার দায়ীত্ব দিয়েছে সেইগুলশান ইয়্যুথ ক্লাবকে।
মাঠটিকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লড়ছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, মাঠ-পার্ক আইনে বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা আছে, জনগণের জন্য মাঠ উন্মুক্ত রাখতে বলা আছে। তাছাড়া বিশেষভাবে এই মাঠ নিয়ে আদালতে দুটি রায় আছে। দুই রায়েই এটির বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে বলা রয়েছে। অথচ আইন ও আদালতের নির্দেশকে উপেক্ষা করে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর মাঠটি গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবকে দিয়েছে। তিনি বলেন, শুধু আইন বা আদালতের রায়ই নয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী ইশতেহারেও মাঠ-পার্ক জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ তার আসনেই এভাবে জনগণের মাঠে দুর্বৃত্তায়ন করেছে রাজউক। আমি মনে করি এটা আইনের লঙ্ঘন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা এবং জনস্বার্থের বিরোধী অবস্থান। কি বলছে রাজউক ও পরিবেশবাদীরা?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আমরা মাঠ তৈরি করি, পরিচালনা আমাদের কাজ নয়। আমরা পরিচালনার জন্য এ মাঠ সিটি করপোরেশনকে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তারপর আমরা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা পরিচালনা কমিটি করেছিলাম। তারাও ব্যার্থ হয়েছে। তাই রক্ষণাবেক্ষণের যোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান না পেয়েই ওই ক্লাবকে মাঠ দিতে বাধ্য হয়েছি। তবে তাদেরকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে মাঠ দেয়া হয়েছে। মাঠের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আমি এটাকে বাণিজ্যিক ব্যবহার মনে করছি না। মাঠ পরিচালনা করতে অনেক খরচ লাগে তাই তাদেরকে নূন্যতম খরচ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আপনারা যদি বিনা খরচে মাঠ চালাতে পারবেন বলেন তাহলে আমি আপনাদের দিতেও প্রস্তুত আছি। তবে বাড়তি টাকা নেওয়ার যে অভিযোগ আপনি করলেন সেটা আমরা খতিয়ে দেখবো এবং ব্যবস্থা নেবো। এ বিষয়ে নগর পরিবেশবিদ আবু জোবায়ের বলেন, আমাদের প্রজন্মের বিকাশের জন্য খেলার মাঠ খুবই প্রয়োজন। অথচ যেখানে ৯০ এর দশকের পরও ঢাকায় উন্মুক্ত খেলার মাঠ ছিল ১৫০টি, গত ২ দশকে কমে সেটা পৌঁছেছে ২৪টিতে। ঢাকার দুই সিটিতে ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে বর্তমানে মাঠ আছে মাত্র ৪১টিতে। আমাদেকে বাঁচতে হলে এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। সরকারি উদ্যোগে মাঠ তৈরি দরকার। কিন্তু সেটা না করে উল্টো সরকারি মাঠ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়, সব মাঠ যদি এলিটদের জন্য করা হয় সেটা দুঃখজনক। ৮ হাজার টাকা দিয়ে সন্তানকে খেলতে নেওয়া এই শহরের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব না। তাই মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই।
সরকার মাঠ-পার্ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হলে ট্যাক্স কেন নিবে প্রশ্ন তুলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মাহমুদ খান বলেন, রাজউক বা সিটি করপোরেশনের কাজ জনগণের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী উপহার দেওয়া। বাসযোগ্য নগরীর অন্যতম প্রধান শর্ত এখানে মাঠ-পার্ক-জলাশয়সহ পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান থাকবে। মানুষ সেখানে হাটতে পারবে খেলতে পারবে। কিন্তু আমাদের শহরে একেতো মাঠ-পার্ক প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সেখানে যেই মাঠে একসঙ্গে খেলতে পারার কথা ৩-৪শ’শিশু কিশোর আমরা সেই মাঠকে টাকার বিনিময়ে করে দেওয়া হচ্ছে অল্প কিছু বিত্তবানের। সরকারতো শুধু বিত্তবানদের নয়। তিনি আরও বলেন, জনগণ ট্যাক্স দেয় সুযোগ সুবিধা পেতে। কিন্তু জনগণের মাঠ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় অক্ষমতার কথা বলছে রাজউক-সিটি করপোরেশন। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় আমাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় যায়? সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকার এত টাকা ব্যয় করতে পারলে মাঠ ব্যবস্থাপনায় কেন পারবে না?
নিউজ সেভেন ডেইজ টিম 
























