এ বছরের মে মাসে লম্বা ছুটির আগে অফিসগুলোতে শেষ মুহূর্তের কাজ চলছিল।এমন সময় নারায়ণগঞ্জের পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আরটি ফ্যাশন কাস্টমসকে জানায়, তারা প্রায় ৮৪ লাখ টাকা মূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট রপ্তানির ঘোষণাপত্র জমা দেয়। এরপর তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনলাইন কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে নথিভুক্ত হয়। স্বাভাবিক নিয়মে পণ্য প্রথমে একটি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) যাওয়ার কথা। সেখানে কাস্টমস কর্মকর্তারা রপ্তানি ঘোষণার তথ্য যাচাই করেন, পণ্য পরীক্ষা করেন এবং কাগজপত্র মিলিয়ে দেখেন। ছাড়পত্র পাওয়ার পর কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার কথা। এরপর সেটি জাহাজে তোলা হয়। আরটি ফ্যাশনের চালানটিও কাস্টমসের ব্যবস্থায় ছাড়পত্র পাওয়া এবং দেশ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত বলে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই, কোনো পণ্যই ছিল না।
নারায়ণগঞ্জের কারখানা থেকে ঘোষিত আইসিডি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডে কোনো পণ্য যায়নি। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরেও কোনো পণ্য পৌঁছায়নি। সরকারি নথি যাচাই করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তারপরও জাল কাগজপত্র, স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে চালানটিকে রপ্তানি হিসেবে দেখানো হয়। ২৬ মে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তানজিনা জান্নাত আইভি এবং আরও তিন কাস্টমস কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর জাল করে চালানটি ছাড় করা হয়েছে বলে দেখানো হয়।রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, আরটি ফ্যাশনের চালানসহ অন্তত চারটি চালানে তার ও তার সহকর্মীদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। ছুটির পর কাস্টমস কর্মকর্তারা কাগজপত্র যাচাই করার সময় দেখেন, চালানটি এরই মধ্যে রপ্তানি হয়েছে বলে নথিভুক্ত হয়ে গেছে। ডিপোর দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার শুভ্র দেব মন্ডল বলেন, পণ্য জাহাজে তোলার শেষ দিনে কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রতারকরা জনবল সংকটের সুযোগ নিয়েছে। ওই দিন কর্মকর্তাদের ওপর দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ ছিল। ২৯টি ভুয়া রপ্তানি চালানের ঘোষণা তিনটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ, আলফা টেক্সটাইল লিমিটেড ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্সি। চালানগুলো দুটি বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়। এগুলো হলো সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড এবং পোর্ট লিংক লজিস্টিকস সেন্টার লিমিটেড।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানির সময় পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে কিছু রপ্তানিকারক বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন। পরে সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধ দেখাতেও ভুয়া রপ্তানির কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। দুটি ঘটনাই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একজন কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ যে ভুয়া রপ্তানির ঘটনা ধরা পড়েছে, সেটি হয়তো আরও বড় একটি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পণ্যের দামে ছাড়, ক্রেতার অর্ডার বাতিল এবং রপ্তানি আয় দেশে আনতে দেরি হলে দুই সংস্থার তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য হতে পারে। তবে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান খুবই অস্বাভাবিক। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার। তিনি বলেন, বারবার ভুয়া রপ্তানির ঘটনা এবং দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি তথ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান—দুটো বিষয়ই বাংলাদেশের রপ্তানি তথ্য ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। আগের ঘটনাগুলোতে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ধরনের প্রতারণা বারবার ঘটছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, আগের তদন্ত কমিটিগুলো পুরো অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের ফরেনসিক অডিট করার সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু সেই সুপারিশ কখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম হলো জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) উদ্ভাবিত কম্পিউটারাইজড স্বয়ংক্রিয় শুল্ক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। তিনি বলেন, সিস্টেমের তথ্য, কে কখন সেটিতে প্রবেশ করেছে এবং কখন কোন তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন। শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা দায়ী না আরটি ফ্যাশনের আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
এইচবিএস অ্যাপারেলসের বাণিজ্য ব্যবস্থাপক আবুল খায়ের বলেন, তাদের জানা মতে, প্রতিষ্ঠান থেকে জমা দেওয়া সব কাগজপত্রই আসল। তিনি বলেন, আইসিডি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তারা এ বিষয়ে জবাব দেবেন। আল গালেব ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওয়াব আলী বলেন, ভুয়া রপ্তানি ঘোষণা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তার প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য ব্যবস্থাপক সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ডিলাক্স অ্যাপারেলস লিমিটেডের পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। তিনি তার বাণিজ্য ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখবেন। পরে তার সঙ্গে আরও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন ও ভূঁইয়া ফেব্রিকস লিমিটেডের সঙ্গে এ প্রতিবেদক যোগাযোগ করতে পারেনি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের চালান পরিচালনা করা শাহজালাল এন্টারপ্রাইজের ইকবাল হোসেনও এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস আইসিডির কমিশনার আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান বলেন, বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি কাস্টমস যাচাই করছে। দুটি বেসরকারি আইসিডিতে ভুয়া রপ্তানির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্য ডিপোগুলোতেও তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এই প্রতারণার পুরো চিত্র কতটা বড়, তা বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।
নিউজ ডেস্ক 

























